এআই (AI) কী?
রোবট ওয়েটার
একবার কল্পনা করুন: আপনি একটা রেস্টুরেন্টে ঢুকলেন আর একটা রোবট এগিয়ে এল আপনার অর্ডার নিতে। সে আপনার চেহারা চিনে ফেলল, এটাও মনে রাখল যে আপনি এক্সট্রা চিজ পছন্দ করেন। তারপর কোনো চেয়ারের সাথে ধাক্কা না খেয়ে আপনার কাছে এসে আজকের স্পেশাল স্যুপ নিয়ে একটা জোকসও শোনাল!
রোবটটা কি বুদ্ধিমান? দেখে তো অবশ্যই বুদ্ধিমান মনে হচ্ছে। কিন্তু সে কি সত্যিই কিছু চিন্তা করছে? সে কি জানে চিজ জিনিসটা আসলে কী, নাকি সে শুধু আগে থেকে দেওয়া খুব দারুণ কিছু ইনস্ট্রাকশন বা নির্দেশ মেনে চলছে?
এই যে প্রশ্নটা — মেশিনের কোন জিনিসটাকে আমরা বুদ্ধিমত্তা বা ইন্টেলিজেন্স বলব — এটাই হলো আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের (Artificial Intelligence) মূল ভিত্তি।
ছোট্ট একটু ইতিহাস: টুরিং থেকে আজকের দিন
এআইয়ের গল্পটা শুরু হয় ১৯৫০ সালে অ্যালান টুরিং (Alan Turing)-এর করা একটি খুব সাধারণ প্রশ্ন দিয়ে: "মেশিন কি চিন্তা করতে পারে?" তিনি টুরিং টেস্ট (Turing Test) নামের একটা পরীক্ষার কথা বলেছিলেন — যদি কোনো মানুষ কোনো মেশিনের সাথে চ্যাট করে এটা বুঝতেই না পারে যে সে মানুষ নাকি মেশিনের সাথে কথা বলছে, তবে সেই মেশিনকে বুদ্ধিমান বলা যেতেই পারে!
১৯৫৬ সালে ডার্টমাউথ কলেজের (Dartmouth College) কয়েকজন গবেষক প্রথম "আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স" শব্দটার ব্যবহার শুরু করেন। তাঁরা বেশ জোর দিয়েই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, আর এক প্রজন্মের মধ্যেই মেশিন মানুষের সমান বুদ্ধিমান হয়ে যাবে। তবে সত্যি বলতে কি, তাঁরা একটু বেশিই আশাবাদী ছিলেন।
খুব সংক্ষেপে এআইয়ের টাইমলাইন বা ইতিহাসটা হলো এমন:
- ১৯৫০-৬০-এর দশক — স্বপ্ন দেখার সময়। এমন কিছু প্রোগ্রাম বানানো হলো যেগুলো চেকারস (checkers) খেলতে পারত আর অঙ্কের উপপাদ্য প্রমাণ করতে পারত। মানুষের উত্তেজনা তখন আকাশছোঁয়া!
- ১৯৭০-৯০-এর দশক — এআইয়ের শীতকাল বা AI Winter। যখন দেখা গেল শুরুর দিকের সেই বড় বড় প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবে রূপ নিচ্ছে না, তখন ফান্ডিং আসা প্রায় বন্ধ হয়ে গেল। বোঝা গেল, বুদ্ধিমত্তা জিনিসটা সবার ধারণার চেয়েও অনেক বেশি কঠিন।
- ১৯৯০-২০০০-এর দশক — চুপিসারে ফিরে আসা। ১৯৯৭ সালে আইবিএমের (IBM) সুপারকম্পিউটার ডিপ ব্লু (Deep Blue) বিশ্বসেরা দাবাড়ু গ্যারি কাসপারভকে হারিয়ে দিল। মেশিন লার্নিং (Machine learning) নিয়ে মানুষ এবার সিরিয়াস হতে শুরু করল।
- ২০১০ থেকে বর্তমান — বিস্ফোরণের যুগ। ডিপ লার্নিং (Deep learning), বিশাল সাইজের সব ডেটাসেট (Datasets) আর পাওয়ারফুল জিপিইউয়ের (GPU) বদৌলতে বিশাল পরিবর্তন এল। 'আলফাগো' (AlphaGo) বিশ্বের সেরা গো (Go) খেলোয়াড়কে হারিয়ে দিল, চ্যাটজিপিটি (ChatGPT) মানুষের মতো সুন্দর করে প্রবন্ধ লিখতে শুরু করল, আর রাস্তায় নামল সেলফ-ড্রাইভিং গাড়ি।
আমরা এখন এআইয়ের ইতিহাসে সবচেয়ে উত্তেজনাময় একটা সময়ে বাস করছি। আর এই সবকিছুর শুরু হয়েছিল কিন্তু ওই একটাই প্রশ্ন দিয়ে: মেশিন কি চিন্তা করতে পারে?
তিনটি মূল ভিত্তি: বোঝা, চিন্তা করা এবং কাজ করা (Perceive, Reason, Act)
যেকোনো বুদ্ধিমান সিস্টেম সে মানুষ হোক বা মেশিন — মূলত তিনটি কাজ করে:
- বোঝা বা Perceive — চারপাশের পৃথিবী থেকে তথ্য নেওয়া। মানুষের ক্ষেত্রে এটা হলো চোখ, কান বা স্পর্শের মাধ্যমে। আর এআইয়ের ক্ষেত্রে এটা হলো ক্যামেরা, মাইক্রোফোন, সেন্সর আর নানা রকমের ডেটা।
- চিন্তা করা বা Reason — ওই পাওয়া তথ্যগুলোকে বিশ্লেষণ করা। তথ্যের ভেতরে প্যাটার্ন বা মিল খুঁজে বের করা, কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো এবং কোনটা জরুরি সেটা ঠিক করা।
- কাজ করা বা Act — চিন্তা-ভাবনা শেষে দরকারী কোনো একটা কাজ করা। যেমন: নড়াচড়া করা, কথা বলা, কোনো কিছু সাজেস্ট করা, ভবিষ্যদ্বাণী করা বা নতুন কিছু তৈরি করা।
আমাদের সেই রোবট ওয়েটারটা তার ক্যামেরা আর সেন্সর দিয়ে বুঝতে পারে ("ওই টেবিলে দুজন মানুষ বসে আছে")। সে তার প্রোগ্রামিং দিয়ে চিন্তা করে ("ওরা এখনো খাবার অর্ডার করেনি, আর ওদের মধ্যে একজন রেগুলার কাস্টমার, যিনি পিৎজা পছন্দ করেন")। এবং সবশেষে সে তাদের কাছে গিয়ে মার্গারিটা পিৎজা খাওয়ার অফার দিয়ে কাজটা করে।
বিভিন্ন এআই সিস্টেম একেকটা ভিত্তির ওপর বেশি জোর দেয়। কম্পিউটার ভিশন (Computer vision) সিস্টেমগুলো মূলত 'বোঝা' বা পারসেপশনের কাজটা বেশি করে। রিকমেন্ডেশন ইঞ্জিন (Recommendation engine) (যেমন নেটফ্লিক্স আপনাকে যে সিনেমা সাজেস্ট করে) মূলত 'চিন্তা করা' বা রিজনিংয়ের কাজ করে। আর ফ্যাক্টরির রোবটিক হাত মূলত 'কাজ করা' বা অ্যাকশনের দিকে ফোকাস করে।
তাহলে সবচেয়ে জাদুকরী এআই কোনটা? এমন একটা সিস্টেম যেটা মানুষের মতোই এই তিনটি কাজ নিখুঁতভাবে করতে পারবে। আমরা এখনো পুরোপুরি সেখানে পৌঁছাতে পারিনি — কিন্তু আমরা প্রতি বছরই একটু একটু করে লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।
একটি সাধারণ এআই এজেন্ট
তাহলে... আমাদের রোবট ওয়েটারটা কি সত্যিই বুদ্ধিমান?
এটা নির্ভর করছে আপনি কাকে জিজ্ঞেস করছেন তার ওপর! এ ব্যাপারে দুটি ভিন্ন মত আছে:
- উইক এআই বা Weak AI (যাঁরা বাস্তবে বিশ্বাসী) — রোবটটা "সত্যিই" কিছু বুঝল কি না, তাতে কিছু যায় আসে না। যদি এটি বুদ্ধিমানের মতো কাজ করে এবং আমাদের দরকারি কাজগুলো ঠিকঠাক করে দিতে পারে, তবে সেটুকুই যথেষ্ট। বেশির ভাগ ইঞ্জিনিয়ারই এই মতের পক্ষে।
- স্ট্রং এআই বা Strong AI (যাঁরা দার্শনিক) — আসল বুদ্ধিমত্তার জন্য সত্যিকারের উপলব্ধি (Understanding) এবং চেতনার (Consciousness) প্রয়োজন। একটা মেশিন শুধুমাত্র প্যাটার্ন মিলিয়ে দারুণ কিছু করে দেখালেও তাকে সত্যিকারের বুদ্ধিমান বলা যায় না।
বাস্তব কাজের সুবিধার জন্য আমরা এআইয়ের সংজ্ঞা এভাবে দিই: যেকোনো সিস্টেম, যা এমন সব কাজ করতে পারে যার জন্য সাধারণত মানুষের বুদ্ধির প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে আছে চেহারা চেনা, কথা বোঝা, গেম খেলা, ভাষা অনুবাদ করা, গাড়ি চালানো এমনকি কোড লেখা পর্যন্ত।
খেয়াল করুন, আমরা কিন্তু এখানে বলিনি যে সিস্টেমটাকে চিন্তা করতে হবে। তাকে শুধু কাজটা করে দেখাতে হবে। এই পার্থক্যটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ — আর এটার জন্যই আজকের এআইগুলো একদিকে যেমন এত পাওয়ারফুল, তেমনি অন্যদিকে এত বিতর্কমূলকও বটে!
ছোট কুইজ
পড়া চালিয়ে যান